এর মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। সৌদি আরব ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের এ উত্থান বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যকে নতুন রূপ দেয়ায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী হয়েছে। খবর রয়টার্স।
কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকা দেশটির এ উত্থানকে একটি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণে ওপেকের জ্বালানি তেল নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে যে মার্কিন অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছিল, এখন তারাই বিশ্বের প্রধান জ্বালানি তেল সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকে দেশটির শিলাস্তর (শেল) থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন ব্যাপক হারে বাড়ায় এ উৎপাদন বিপ্লব শুরু হয়।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাত এ প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি তেল রফতানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থানটি দখল করে নিয়েছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ও কৌশলগত মজুদ থেকে জ্বালানি তেল ছাড়ার কারণে গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও জ্বালানি রফতানি দৈনিক ১ কোটি ৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে টানা তিন মাসের মতো শীর্ষ রফতানিকারকের মর্যাদা ধরে রেখেছে দেশটি। মে মাসে রাশিয়ার দৈনিক রফতানি ছিল ৭০ লাখ এবং সৌদি আরবের ছিল ৫৯ লাখ ব্যারেল। অথচ ২০২৫ সালেও সৌদি আরব দৈনিক গড়ে ৮১ লাখ ব্যারেল রফতানি করে শীর্ষে ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি ছিল ৬৬ লাখ ব্যারেল এবং রাশিয়ার ছিল ৫৮ লাখ ব্যারেল।
২০০০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরল উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বেড়ে দৈনিক ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে ওপেকের কোটার কারণে সৌদির উৎপাদন এক কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে ওঠানামা করেছে এবং রাশিয়ার উৎপাদন ২০২০ সাল থেকে কমে দৈনিক এক কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে গেছে। ২০১০ সালে বিশ্বে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক চাহিদা যেখানে ছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল, গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলে। গত ১৫ বছরে বৈশ্বিক চাহিদার যে বৃদ্ধি ঘটেছে, তার সিংহভাগই পূরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এ জ্বালানি বিপ্লব। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ ৪০ বছরের জ্বালানি তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ঠিক ১০ বছর পর বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারক হয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিল দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের এ নতুন আধিপত্য বিশ্ববাজারে ওপেক প্লাসের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাছাড়া গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ওপেকের দীর্ঘ ৬০ বছরের সদস্যপদ ত্যাগ করায় সংস্থাটি বড় একটি ধাক্কা খেয়েছে। শীর্ষ জ্বালানি তেল রফতানিকারক হওয়ায় ওয়াশিংটন এখন বন্ধু ও প্রতিপক্ষ উভয় দেশের সঙ্গেই আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পাবে। বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে, যা নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে। এছাড়া ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়ার দেশগুলোও মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে মার্কিন তেলের দিকে ঝুঁকছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল রফতানির ৪৬ শতাংশ এসেছে এশিয়ায়।